কলকাতা ব্যুরো | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬
কলকাতায় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবনে গভীর রাতে পুলিশের আকস্মিক অভিযানের ঘটনাকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ও চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় ও প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, শুক্রবার দিবাগত রাত (১৩ জুন) আড়াইটায় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সদস্যরা আচমকাই ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের বাড়িতে প্রবেশ করে তল্লাশি চালানোর চেষ্টা চালায়।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV) তৃণমূল সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, মূলত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সচিব (PA) সুমিত রায়কে খুঁজতেই এই মধ্যরাতের হাই-ভোল্টেজ অভিযান। মেদিনীপুরে রুজু হওয়া একটি চাঁদাবাজির মামলায় সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
জানা গেছে, মেদিনীপুর জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল রাত আড়াইটার দিকে কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডে অভিষেকের বাসভবনের সামনে পৌঁছায় এবং ভেতরে তল্লাশি চালানোর দাবি জানায়। ওই সময় বাড়ির মূল ফটকে কর্তব্যরত সাংসদের নিরাপত্তারক্ষী ও কলকাতা পুলিশের জোয়ানরা মেদিনীপুর পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তারক্ষীদের বাধা ঠেলে মেদিনীপুর পুলিশের সদস্যরা জোরপূর্বক বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালায়।
এই খবর পাওয়া মাত্রই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূল সুপ্রিমো তথা পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কালীঘাটের নিজস্ব বাসভবন থেকে পায়ে হেঁটেই দ্রুত ভাতিজা অভিষেকের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। সূত্রের দাবি, সেখানে পৌঁছে তিনি মেদিনীপুর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং কোন এক্তিয়ারে গভীর রাতে একজন বর্তমান সাংসদের বাড়িতে ওয়ারেন্ট ছাড়া ঢোকা হলো—তার কড়া জবাবদিহি চান। মমতার তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কিছুক্ষণ পর পুলিশ দলটি সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজের বাসভবনে ফিরে যান। তবে এই ঘটনার পর থেকে আজ শনিবার সকাল থেকেই অভিষেকের বাড়ির সামনে বিপুল সংখ্যক রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর (Central Forces) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
শনিবার সকালে এই রাতের অভিযান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কিছুটা এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, “আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। এ বিষয়ে যা জানার, তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে গিয়ে জানতে চান।” তবে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর এটি নিছকই ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’।
রাজনৈতিক মহলের মতে, সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভাবনীয় পরাজয়ের পর থেকেই দলের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আইনি ও রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়াতে শুরু করেছে মোদী ও শাহ প্রশাসন। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি পৃথক ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলার সমান্তরাল তদন্ত চলছে।
এরই মধ্যে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন একটি কথিত ‘বিদ্বেষমূলক ও উসকানিমূলক’ বক্তব্যের মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আগামী ১৬ জুন হাজির হওয়ার জন্য নতুন করে নোটিশ পাঠিয়েছে রাজ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID)।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবারই দক্ষিণ কলকাতার ভবানী ভবনে (সিআইডি সদর দপ্তর) অভিষেককে টানা প্রায় ৬ ঘণ্টা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মধ্যরাতের কিছু আগে তিনি সেখান থেকে বের হন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলের জন্য বিভিন্ন পদে নিয়োগসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের ‘জাল স্বাক্ষর’ বা স্বাক্ষরের অসঙ্গতির অভিযোগে এই জেরা করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের অবকাশকালীন একক বেঞ্চের নির্দেশে গ্রেফতারি থেকে ২১ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন আইনি সুরক্ষা পেলেও তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার শর্তে সিআইডির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। ১৬ জুনের নোটিশে সেই মামলাতেই তাঁকে আবারও তলব করা হয়েছে।
অভিষেকের বাড়িতে মধ্যরাতের এই ঝড়ের রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার সকালে তৃণমূলের আরেক দাপুটে নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্রের কামারহাটির (দক্ষিণেশ্বর) বাসভবনেও বড়সড় হানা দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)।
পুরসভা নিয়োগ কেলেঙ্কারি বা পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলার (Municipality Recruitment Scam) তদন্তের অংশ হিসেবে মদন মিত্রের বাড়িতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এই তল্লাশি অভিযান শুরু করেন ইডি গোয়েন্দারা। কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভায় অবৈধভাবে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের অলঙ্কার ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন মদন মিত্র। ইডি সূত্রের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে অন্তত ১২৫টিরও বেশি বেআইনি ও ভুয়া নিয়োগের সঙ্গে মদন মিত্রের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অকাট্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। এই নিয়ে কামারহাটির বিধায়ককে তাঁর ঘরের ভেতরেই ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৃণমূলের দুই শীর্ষ নেতার ওপর কেন্দ্রীয় ও জেলা পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানে তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনীতি।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |